সর্বশেষ

  মহান বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে সৌদি আরবে যুবলীগের প্রস্তুতি সভা   বাংলাদেশ এক্সট্রা মোহরার নকল নবিসদের চাকুরী স্থায়ী করার দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ   শাবি থিয়েটার সাস্টের ১৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন   লাউয়াছড়া উদ্যানে ট্রেনে কাটা পড়ে হরিণ, বিদ্যুৎস্পৃষ্টে উল্লুকের মৃত্যু   জকিগঞ্জের বিরশ্রী ইউপি চেয়ারম্যান ইউনুস আলীর মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া   সিলেট বিভাগীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়দের মাঝে জার্সি বিতরণ   মোগলগাঁও ইউনিয়নে ট্রান্সফরমার চুরির সময় জনতার হাতে চোর আটক, অতঃপর....   ধর্মপাশা মুক্ত দিবস পালিত   মাধবপুরে গোপনে জয়িতা তালিকা!   শ্রীমঙ্গলে ৪ বছরের মাথায় দুটি শাবকের জন্ম দিলো মেছো বাঘ   ভারতে বাংলাদেশী শ্রমিক হত্যায় তাহিরপুর উত্তাল: বিজিবি-বিএসএফ পতাকা বৈঠক বাতিল   অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সিটি ব্যাংক কর্মকর্তা আটক   ফেঞ্চুগঞ্জে ৫৬ লক্ষ টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন   মানবতাবিরোধী অপরাধ : মৌলভীবাজারের ৫ আসামির বিচার শুরু   মায়ানমারকে মালয়েশিয়ার সেনা প্রধানের হুমকি!   আজই অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছেন মুশফিকরা   দুর্নীতি মামলায় জেলা কমান্ডার সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলের জামিন   ফ্রেন্ডস পাওয়ার স্পোর্টিং ক্লাবের ৭ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুক্রবার   আজ মৌলভীবাজার মুক্ত দিবস   চট্টগ্রামে ‘জঙ্গি আস্তানায়’ র‌্যাবের অভিযানে আটক ৩

সৈয়দ মহসিন আলীকে নিয়ে লেখা প্রত্যাহার করলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক

প্রকাশিত : ২০১৫-০৯-১৬ ১৯:১৪:২৬

আপডেট : ২০১৫-০৯-১৬ ২১:৫৫:২২

উত্তরপূর্ব ডেস্ক : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ॥ সম্ভবত ১৯৯৮ সালে দৈনিক প্রথম আলোর রিপোর্টার হিসেবে সিলেট বিভাগ সফরে গিয়েছিলাম। পর্যায়ক্রমে সিলেট বিভাগের চারটি জেলা- সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভিবাজার ও হবিগঞ্জ ঘুরেছিলাম। আমার এসাইনমেন্ট ছিল এলাকার রাজনীতি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন করা। মৌলভিবাজার সফরের সময় আমি অনেকের সাথেই কথা বলেছি। তখন আওয়ামী লীগের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা ছিলেন আজিজুর রহমান এবং সৈয়দ মহসিন আলী। আজিজুর রহমান সম্ভবত তখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন, এর আগের সংসদে ছিলেন বিরোধী দলীয় হুইপ। সারাদেশেই তার পরিচিতি ছিল। আর সৈয়দ মহসিন আলী ছিলেন মৌলভীবাজার পৌরসভার চেয়ারম্যান এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। সবাই বললেন, মহসিন আলী গ্রুপ বেশি শক্তিশালী। একটু অবাক হলাম, কেন্দ্রীয় নেতার চেয়ে স্থানীয় নেতার গ্রুপ বেশি শক্তিশালী হয় কি করে?

একই দিনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল দুই নেতার, সকাল ৭টায় সৈয়দ মহসিন আলীর বাসায় আর দুপুর ২টায় আজিজুর রহমানের। সকালে মহসিন আলীর বাসায় গিয়ে বুঝলাম, কেন তিনি জনপ্রিয়, কেন তিনি টানা পৌরসভা চেয়ারম্যান, কেন তার গ্রুপ বেশি শক্তিশালী। সেই সকালেই তার বাসায় কয়েকশ মানুষ। না পূর্বনির্ধারিত কোনো সভা সমাবেশ ছিল না। এটাই নাকি তার বাসার প্রতিদিনের চিত্র। নানান বিচিত্র সব সমস্যা নিয়ে এসেছেন লোকজন। মহসিন আলী সবাইকে ধমকাচ্ছেন, গালিগালাজ করছেন। কিছু কিছু গালি ও ব্যবহার শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু লোকজন কিছু মনে করছে না। আমি একটু ভড়কে গেলাম। একট ধাতস্থ হয়ে বুঝলাম, এটাই মহসিন আলীর স্বভাব।

পরে আরেকটু খোঁজ নিয়ে জানলাম, মহসিন আলী এমনই। সবাই জানেন, মহসিন আলী গালিগালাজ করলেও তার মনটা ভালো, সুযোগ থাকলে কাজটা করে দেবেন। তাই সকাল থেকেই তার বাড়িতে মানুষের মিছিল শুরু হয়। সেই জনপ্রিয়তায় তিনি টানা তিনবার পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০০৮ সালে নির্বাচিত হন সংসদ সদস্য। গতবছর ভোটারবিহীন নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবার পর জীবনে প্রথমবারের মত মন্ত্রী হন তিনি, দায়িত্ব পান সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের, যেটা তিনি বরাবর করে আসছিলেন।

মন্ত্রী হওয়ার পরপরই বিপাকে পড়েন তিনি। একটি স্কুলের অনুষ্ঠানে গিয়ে প্রকাশ্যে ধূমপান করেন। সেই ছবি পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পরই তাকে নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড়। মাফ টাফ চেয়ে সে যাত্রা পাড় পেয়ে যান তিনি। তখন দেখলাম শুধু সাধারন মানুষ নয়, সাংবাদিকদের মধ্যেও তিনি বেশ জনপ্রিয়। সিনিয়র সাংবাদিকদের অনেকেই তার হয়ে আমাদের বললেন, তোমরা একটা ভালো মানুষের পেছনে লেগেছো কেন? আমরা যতই বলি একজন মন্ত্রী স্কুলের মঞ্চে বসে প্রকাশ্যে বসে ধূমপান করলে তিনি ভালো হন কী করে? তারা হাসেন আর বলেন, এইটাই মহসিন আলী। এইজন্যই তিনি ভালো মানুষ। তিনি যা তাই, সবসময় একইরকম। কোনো ভাণ-ভনিতা নেই। তার মনে যা, মুখে তা। মুখে মধু, অন্তরে বিষ- ধরনের হিপোক্র্যাট তিনি নন। তবু আমি কনভিন্স হই না পুরোপুরি। না হলেও কিছুটা নরম হই।

কিন্তু কিছুদিন পর যখন তিনি ঢাকায় এবং সিলেটে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করলেন, তখন মনটা আবার বিষিয়ে যায়। বিশেষ করে সিলেটে সাংবাদিকদের ‘খবিশ’বলে অভিহিত করে অশ্লীল আক্রমণের পর আমি বেশ ক্ষুব্ধ হই। আমি সবসময় চেষ্টা করি, রাগ, অনুরাগ, বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সবার প্রতি সমান আচরণ করতে। কিন্তু সাংবাদিকদের প্রতি সৈয়দ মহসিন আলীর বক্তব্য শোনার পর আমার যথেষ্টই রাগ হয়েছিল। রাগ কমানোর জন্য আমি তিনদিন অপেক্ষা করে লিখতে বসি। ‘মহসিন আলী সৎ, কিন্তু সভ্য ও সুস্থ নন’শিরোনামের লেখাটি একটি অনলাইনে ছাপা হয়েছিল। লেখাটি যারা পড়েছেন, তারা নিশ্চয়ই ভাবছেন, মহসিন আলীর মৃত্যুতে আমি হয়তো মনে মনে হলেও খুশী হয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ঘটেছে উল্টো। তার মৃত্যুর কথা শোনার পর থেকেই গভীর বেদনায় আচ্ছন্ন আমার মন। বারবার মনে হচ্ছে, আমাদের রাজনীতির এক বর্ণাঢ্য চরিত্র; যিনি সত্যিকারের মাটির কাছাকাছি, মানুষের কাছাকাছি ছিলেন; তার মৃত্যুর ক্ষতি আসলে পূরণ হওয়ার নয়। নিজের লেখাটি আবার পড়ার পর, তুমুল একটা অপরাধবোধ আর গ্লানি আচ্ছন্ন করে রেখেছে আমাকে। তিনদিন পর লিখেলেও লেখাটিতে আসলে আমি আমার বিরাগটা আড়াল করতে পারিনি। মহসীন আলী সাংবাদিকদের গালি দিয়েছেন, আমিও একজন সাংবাদিক হিসেবেই তাকে প্রতিপক্ষ ভেবে মনের ঝাল মিটিয়েছি। একজন মন্ত্রীকে যথেষ্ট গালাগাল করতে পেরেছি বলে তখন অনেকের বাহবাও পেয়েছিলাম। কিন্তু আমি আসলে বাহবা পাওয়ার জন্য লিখিনি। তখন আমার কাছে সত্যি মনে হয়েছে বলেই লিখেছি।

কিন্তু পরে তার সম্পর্কে আরো জেনে এবং কাছ থেকে দেখে মনে হয়েছে, আমি আসলে মহসিন আলীকে চিনতে পারিনি। এটা আমার ব্যর্থতা। মহসিন আলী বলেছেন বলে, আমার বা আমাদের খুব গায়ে লেগেছে। কিন্তু শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যিটা হলো, মহসিন আলী যেমন বলেছেন, তেমন ‘খবিশ’ সাংবাদিক তো দেশে অনেক আছে। অনেক সাংবাদিক আছেন, যারা কারণে-অকারণে মানুষের পেছনে লাগে, তাদের সম্মানহানি করে।

লেখাটির একটি অংশ আমি উদ্ধৃত করছি ‘সৈয়দ মহসীন আলী সৎ, সরল, সহজ ভালো মানুষ হতে পারেন। কিন্তু তিনি সভ্য মানুষ নন। কারণ সভ্য সমাজের মানুষ মনে যা ভাবেন, তার পুরোটা বলেন না। বলার আগে ভাবেন, তার কথা কাউকে আহত করছে কিনা, তার কথা সামাজিক সভ্যতা-ভব্যতা-শালীনতা সীমা মানছে কিনা। মহসীন আলীর বক্তব্য সব সীমা অতিক্রম করেছে।’ লেখার এই অংশের সাথে আমি এখনও একমত। গতবছর ৯ আগস্ট সিলেটে মহসীন আলীর বক্তব্য সত্যিই শালীন ছিল না। কিন্তু মহসীন আলী আসলেই আমাদের মত সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তার সভ্যতা, শালীনতার মাপকাঠি; আমাদের শহুরে সভ্যতার সমান্তরাল নয়। আমরা মনে গভীর তেতো বিদ্বেষ গোপন করে হাসি হাসি মুখে কথা বলি। আর মহসীন আলী যা মনে আসে অবলীলায় তা বলে ফেলেন। তখন আমরা নাগরিক সভ্যরা গেল গেল রব তুলি। এমন মাটিঘনিষ্ঠ মানুষের আসলে মৌলভিবাজারের মনু নদীর পাড়ে পূর্ণিমা রাতে বসে বসে গান গাওয়াই শোভা পায়, মন্ত্রিসভায়; অ্যাটিকেট-ম্যানারে সাজানো আমাদের এই নাগরিক সভ্যতায় তিনি বড্ড বেমানান। গানের কথাই যখন এলো, তখন তাকে ভুল বোঝার আসল কারণটা বলি। মহসীন আলী যেখানে সেখানে গান গাইতেন। যে কোনো অনুষ্ঠানে, এমনকি নিজের মেয়ের বিয়েতেও বেসুরো গলায় গান ধরেন তিনি। তার এই কাজটি নিয়ে অনেক হাসাহাসি হয়েছে। কিন্তু তিনি থামেননি। এটা করতে অনেক সাহস লাগে। আমিও তার মত। কিন্তু সবসময় গুণগুণ করি বা বড় জোর গলা মেলাই। কিন্তু কোনো আড্ডায় গাওয়ার মত সাহস পাই না। পরে জানলাম, গলায় সুর না থাকলেও কয়েক হাজার গানের কথা মুখস্ত তার। শুনে অভিভূত হয়েছি। গানের প্রতি যার এতটা ভালোবাসা, তিনি খারাপ হতেই পারেন না।

তাকে বিশেষ ভালো লাগার আরো একটা কারণ হলো তার দেশপ্রেম। এমনিতে সকল মুক্তিযোদ্ধার প্রতি আমার বিশেষ শ্রদ্ধা আছে। মহসিন আলীও সেই বিবেচনায় ছিলেন। কিন্তু মহসিন আলী যখন যুদ্ধের কথা বলতেন, দেশের কথা বলতেন, তখন তার গলায়, চেহারায়, অবয়বে দেশের প্রতি যে গভীর মমতা ফুটে উঠতো তা সত্যিই বিরল। তার দেশপ্রেম যে খাঁটি তা অনুভব করতে পারবেন তার ঘোর শত্রুও। মুক্তিযুদ্ধে এক কিশোর সহযোদ্ধাকে হারানোর বেদনা তিনি বয়ে বেরিয়েছেন সবসময়। মিডিয়ার কল্যাণে তার একটা ভিলেন বা ভাড়ের ভাবমূর্তি গড়ে উঠলেও কেউ তার বিরুদ্ধে কোনো অসততা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা মাস্তানির অভিযোগ তুলতে পারেনি। তার একটাই সমস্যা ছিল- বেফাঁস কথা বলা। কিন্তু এটাকে তিনি সমস্যা মনে করতেন না। যা বলতেন, মন থেকে বলতেন এবং তাতে দৃঢ় থাকতেন।

ঈদে এটিএন নিউজে একটা অনুষ্ঠান হয় ‘নিউজিক’ নামে। একজন কণ্ঠশিল্পীর সাথে আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে গান হয় এ অনুষ্ঠানে। গতবছর ঈদে এ অনুষ্ঠানের অতিথি ছিলেন সৈয়দ মহসীন আলী। মুন্নী তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল আসলে গ্রিল করার জন্য, হাস্যকর করার জন্য। কিন্তু ঘটেছে উল্টো ঘটনা। রেকর্ডিং শেষ হওয়ার পর মুন্নী তার ভক্ত বনে যায়। তার সেই মুগ্ধতা পরে আরো বেড়েছে। মহসীন আলীর মৃত্যুর পর প্রিয়জন হারানোর বেদনায় আচ্ছন্ন মুন্নী।

আমার সাথে এক দু’বার দেখা হলেও তেমন ঘনিষ্ঠতা ছিল না। তাই আমার বেদনা মুন্নীর মত অত তীব্র নয়। তবে আমার বেদনার চেয়ে গ্লানি বেশি। আপনারা হয়তো ভাবতে পারেন, মৃত্যুর পর কারো সম্পর্কে ভালো লিখতে হয় বলেই আমি লিখছি। আসলে তা নয়, মহসিন আলীকে নিয়ে লিখতেই হবে, এমন কোনো দিব্যি কেউ দেয়নি। তার সাথে আমার তেমন ঘনিষ্ঠতাও ছিল না। তিনি আমার এলাকার কেউ নন। তার পরিবারের আর কাউকেই আমি চিনি না। তবুও একজন ঠিক মানুষকে ভুলভাবে চিত্রিত করার গ্লানি মোচন করতেই এ লেখা। এটি আসলে একটি ভুল লেখা প্রত্যাহারের ঘোষণা। আর একজন খাটি দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক: প্রভাষ আমিন
অ্যাসোসিয়েট হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

উত্তরপূর্ব২৪ডটকম/ডেস্ক/এমওআর

এ বিভাগের আরো খবর


সর্বশেষ খবর


সর্বাধিক পঠিত