সর্বশেষ

  কবি শান্ত খুমন আর নেই   কর্মসংস্থান ব্যাংক অফিসার্স এসোসিয়েশন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনোজ রায়কে সংবর্ধনা প্রদান   ৫ পদে ৮ জন লোক নেবে সিলেট মহানগর পুলিশ   নবীগঞ্জে পল্লীবিদ্যুতের ‘ভুতুড়ে’ বিলের চাপে গ্রাহক, এলাকায় অসন্তোস   বীরপ্রতীক কাকন বিবির শয্যাপাশে মহানগর যুবলীগের নেতৃবৃন্দ   হবিগঞ্জে চার শিশু হত্যা মামলা: ৩ আসামির ফাঁসির রায়   বিয়ের আগে রাজনীতি বুঝতাম না: রিজিয়া নদভী   কলেজছাত্রীকে পেটানো সেই ছাত্রলীগ নেতা বহিষ্কার   ওসমানীনগরের বেগমপুর শরৎ সুন্দরী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক আব্দুল লতিফ আর নেই   মোবাইল কোর্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে রাখার দাবি ডিসিদের   এবারের এইচএসসির ফলাফলে গোয়াইনঘাটের তোয়াকুল কলেজ শীর্ষে   বিয়ানীবাজারে জনতার হাতে প্রতারক আটক   রায় শোনার অপেক্ষায় সুন্দ্রাটিকি গ্রামের নিহত ৪ শিশুর পরিবার   সিলেটের আইকন খেলোয়াড় সাব্বির   ফেসবুকে ‘বিশ্বনাথীকে’ নিয়ে শিক্ষকের কটুক্তি : উপজেলা চেয়ারম্যান বরাবর অভিযোগ   জগন্নাথপুরে খুন ও ডাকাতির মামলার আসামি গ্রেফতার   কুলাউড়ার বন্যাকবলিত এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎলাইন : দুর্ঘটনার আশঙ্কা   ধর্মপাশায় বিএনপির সদস্য সংগ্রহ উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা   বিয়ানীবাজারে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম শুরু   ওসমানী মেডিকেল কলেজে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন

ঐশীর ফাাঁসির রায়: ফিরে তাকাতে হবে নিজেদের দিকেও

প্রকাশিত : ২০১৫-১১-১৪ ০১:০৬:৫৭

শান্তা মারিয়া : ॥ ঐশীর ফাঁসির রায় হয়েছে। বাবা-মাকে হত্যাকারী সন্তানের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির রায় ঘোষিত হয়েছে। হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে সমাজ। যাক, এমন অপরাধ করার আর কেউ সাহস করবে না। আর কারও মেয়ে বিপথে যাবে না, আর কারও মেয়ে ইয়াবা খাবে না, আর কারও রাতের ঘুম হারাম হবে না। কী শান্তি!

কিন্তু সত্যিই কি তাই? যে অপরাধে ঐশীর ফাঁসির রায় হল, সে অপরাধের দায় কি একা তার ছিল? আমাদের সমাজে এমন আরও কত ঐশী রয়েছে যারা মাদকের নেশায় জীবনকে নিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসের পথে, তার হিসাব কি আমরা রেখেছি? সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে বিষ ছড়িয়ে পড়েছে, এক ঐশীকে ফাঁসি দিয়ে কি সে বিষ থেকে মুক্ত হওয়া যাবে? ঐশীদের বিপথে ঠেলে দিচ্ছে যে সমাজ, যে দুর্নীতি, যে মাদক, যে বৃহত্তর কারণগুলো এবং সেগুলোর যারা জন্ম দিচ্ছে তাদের ফাঁসি কবে হবে, তাদের শাস্তি দেবে কারা?

ঐশীর হাত-খরচ ছিল মাসে এক লাখ টাকা। তার পুলিশ অফিসার বাবার বেতন তাহলে কত ছিল যে মেয়েকে এক লাখ টাকা দেওয়া চলত? বুঝতে বাকি থাকে না এই টাকা আসে অবৈধ পথে। অবৈধ রোজগারের টাকায় প্রতিপালিত সন্তান যখন বিপথে যায়, তখন তার দায় বাবা-মায়ের এবং যে সমাজ অবৈধ রোজগারকে প্রমোট করে সেই সমাজেরও। যে বাবা-মা কিশোর-তরুণ সন্তানের হাতে অবৈধ পথে উপার্জিত রাশি রাশি টাকা যোগান দিয়ে তাদের বিপথে পাঠায় তাদের কতখানি শাস্তি প্রাপ্য সে কথা তো বলার অপেক্ষা থাকে না। বাবা-মা যখন অবৈধ রোজগারের ধান্ধায় মত্ত থাকে তখন সন্তান তো বিপথে যাবেই।

ঐশী যখন তার বন্ধুদের নিয়ে ইয়াবা খেত, যখন ডিজে পার্টিতে যেত তখন তার এবং তার বন্ধুদের বাবা-মা চোখ বন্ধ করে ছিল কেন? তারা তখন কী কাজে মত্ত থাকত, কোন নেশায় মত্ত থাকত সে প্রশ্ন কেন কেউ করে না। এই সদ্য তরুণ-কিশোর ছেলেমেয়েরা মাদক পায় কোথায়? এ দেশে এত মাদক আসে কোন পথে? সেই মাদক ব্যবসায়ীদের কেন শাস্তি হয় না? তারা কেন ফাঁসিতে ঝোলে না? দুর্নীতিবাজ পুলিশ অফিসাররা মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যখন কোটি কোটি টাকা রোজগার করে তখন তাদের কেন ফাঁসি হয় না?

তরুণ সমাজকে যারা মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যারা তাদের হাতে ইয়াবা তুলে দিচ্ছে তাদের ফাঁসি হওয়া উচিত আগে। মানলাম, ঐশী একটি বিপথে যাওয়া মেয়ে। কিন্তু তার বিপথে যাওয়ার পিছনে দায়ী কে? তাদের কি আগে শাস্তি হওয়া উচিত নয়? তার মতো তরুণ ছেলেমেয়েরা যখন এক পা এক পা করে বিপথে যায়, তখন বাবা-মা চোখ বন্ধ করে থাকে কেন? কেন তাদের হাতে অবৈধ টাকা তুলে দিয়ে তাদের ফাঁসির পথ পরিস্কার করে? কেন তাদের সুশিক্ষা দেয় না? সমাজে মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের সহযোগীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর ফাঁসিতে ঝোলে বলির পাঁঠা ঐশীরা।

শুধু মাদকের প্রশ্নও নয়। আমরা তরুণ প্রজন্মকে আরও নানাভাবে বিপথে ঠেলে দিচ্ছি। এই দায় আমাদের সকলের। এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করি। আজ থেকে বিশ বছর আগের ঘটনা। আমি তখন একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা করতাম। সেখানে একবার কেজি ক্লাসের এক শিশুর কাছে পাঁচশ টাকার নোট দেখে অবাক হলাম। ভাবলাম বাচ্চাটি হয়তো বাবা-মাকে না জানিয়ে টাকা নিয়ে এসেছে। ওর অভিভাবকদের ডেকে পাঠালাম। ব্যস্ততার কারণে বাবা আসতে পারলেন না, এলেন মা। ঘটনা শুনে তিনি বললেন, ‘আমরা ধনী মানুষ। আমাদের ছেলেমেয়েদের কাছে পাঁচশ, এক হাজার টাকা তো থাকবেই।’

যতই তাকে বুঝাই যে, এটুকু শিশুর হাতে এত টাকা দেওয়া ঠিক নয়, তিনি সেটা বুঝতে চান না। উল্টো আমার উপর ক্ষিপ্ত হন। শেষ পর্যন্ত বললেন, ‘আমাদের ঘরের বাচ্চাদের হাতে হাজার হাজার টাকা থাকবেই। আপনারা দেখবেন সেটা যেন কেউ চুরি না করে।’

বললাম, ‘আমি শিক্ষক, আপনার বাচ্চার দারোয়ান নই।’

বিশ বছর পার হয়েছে। যদি কোনো দিন শুনতে পাই সে দিনের সেই ছোট্ট শিশুটি বড় হয়ে স্মাগলার হয়েছে বা কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত হয়েছে, আমি তো তার বাবা-মাকেই দোষী সাব্যস্ত করব।
আমাদের তরুণ প্রজন্মের সামনে কী আদর্শ আমরা রাখতে পারছি? আমাদের সমাজের কিশোর-তরুণরা তাদের চারপাশে দেখছে প্রশ্নফাঁসকারী, ধর্ষক, দলীয় তল্পিবাহক শিক্ষক, ভণ্ড ও দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, দুর্নীতিবাজ সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও ঘুষখোর পুলিশ, সুবিধাবাদী ও ধামাধরা বুদ্ধিজীবী, ফাঁকিবাজ ঘুষখোর আমলা, চিকিৎসক। তাহলে কার উপর তারা শ্রদ্ধা রাখবে, কার আদর্শে পথ চলবে?

শুধু যে অসাধু ধনীর সন্তানরা বিপথে যাচ্ছে তা নয়, লোভী ও নীতিহীন দরিদ্রের সন্তানও একইভাবে বিপথু হচ্ছে। মূল্যবোধহীনতায় আক্রান্ত হয়েছে গোটা সমাজ। সন্তানদের আমরা না দিচ্ছি সুস্থ বিনোদনের খোঁজ, না দিচ্ছি সংযমের শিক্ষা। উপরন্তু তাদের হাতে তুলে দিচ্ছি অবৈধ রোজগারের টাকা। তাহলে তারা বিপথে যাবে না তো কী করবে?

মনে পড়ছে স্কুল জীবনে দু’টাকার আইসক্রিম কিনে বান্ধবীর সঙ্গে ভাগ করে খেতাম। আমার বাবা ভালো বেতনে চাকরি করতেন, বান্ধবীর বাবা ছিলেন স্বচ্ছল ব্যবসায়ী। তাদের সামর্থ্য ছিল আমাদের হাতে কিছুটা টাকা-পয়সা দেওয়ার। কিন্তু তারপরও সংযমের মধ্যে আমাদের বড় করেছেন এই আশায় যেন আমরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ হাতে পেয়ে তা বাজে খরচ না করি। তারা আমাদের হাতে বই তুলে দিতেন। কোনো কিছু চাইবার আগে আমাদের দশবার ভাবতে হত সেটা আমরা পাব কি না কিংবা আমরা সেটা পাওয়ার যোগ্য কি না।

কিছু দিন আগে আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক তার স্কুলপড়ুয়া মেয়ে ও তার বন্ধুদের জন্য এক তিন তারকা হোটেলে পার্টির বন্দোবস্ত করতে মোটা অংকের টাকায় বুকিং দিলেন। বললেন, মেয়ে তার বন্ধুবান্ধব নিয়ে সন্ধ্যায় খাবে। ভদ্রলোক পেশাজীবী এবং মাঝারি বেতনে চাকরি করেন। জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা হয়, এত টাকা তিনি পান কই। তাছাড়া ছেলেমেয়ের বন্ধুদের বাড়িতে ডেকে খাওয়ালেই তো পারেন, এত বিলাসিতার আড়ম্বর কেন? ভবিষ্যতে এই মেয়েটি যদি বখে যায় তাহলে আমি তার বাবাকেই দায়ী করব। আমরা সন্তানদের ‘প্লেইন লিভিং হাই থিংকিং’য়ের শিক্ষা না দিয়ে ভোগবাদী বানাচ্ছি, নিজেরাও অসৎ নেশায় মত্ত হয়ে পড়ছি। ভাবছি এটাই আধুনিকতা।

ইলেকট্রিক গিটার কেনার টাকা না পেয়ে দুই কিশোর-কিশোরীর আত্মহত্যার সংবাদ পেয়েছি। ছোটবেলা থেকে সংযমী হওয়ার শিক্ষা পেলে এই দুঃখজনক অকালমৃত্যু হয়তো দেখতে হত না। আমার বাড়ির খণ্ডকালীন গৃহকর্মীর কিশোরী মেয়ে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে নতুন পোশাক কেনার বায়না ধরেছে তার দরিদ্র মায়ের কাছে। না পেলে আত্মহত্যার হুমকিও দিয়েছে। তার মা শেষ সম্বল কানের ফুল বিক্রি করে তা কিনে দিয়েছে। এই অসংযমী সন্তানদের জন্য কি বাবা-মায়ের ভুল শিক্ষাই দায়ী নয়?

ঐশীর ঘটনাটি সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, দুর্নীতি ও পচনের চিত্র চোখের সামনে নিয়ে এসেছে। এই তরুণী মেয়েটিকে চরম শাস্তি দেওয়ার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি অবক্ষয়, দুর্নীতি ও পচনের জন্য দায়ী সমাজপতিদের চরম শাস্তি বিধান করা। আজ যদি একটি মাদক ব্যবসায়ী ফাঁসির দড়িতে ঝোলে তাহলে হাজার ঐশী রক্ষা পাবে। একজন ঘুষখোর যদি কঠিন শাস্তি পায় তাহলে হাজার তরুণ বিপথে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবে। আর ঐশীর ইয়াবা খাওয়ার কাহিনি, বয়ফ্রেন্ডদের সমাচার রসিয়ে তুলে ধরার আগে মিডিয়ার উচিত এই সব ঘুষ ও দুর্নীতির কাহিনি তুলে ধরা।

ভিক্টর হুগো ‘লে মিজারেবল’ উপন্যাসে সমাজের অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরে পাপকে ঘৃণা করার ও পাপীকে অনুকম্পা প্রদর্শনের মানবিক আর্জি জানিয়েছিলেন। ঐশীর মতো বিপথু তরুণদের প্রয়োজন যথাযথ চিকিৎসা, সংশোধনমূলক শাস্তি এবং তাদের এ অবস্থার জন্য দায়ীদের গলায় পরানো উচিত ফাঁসির দড়ি। পচে যাওয়া সমাজের গলায় দড়ি না পরিয়ে ঐশীদের যত কঠোর শাস্তিই দেওয়া হোক না কেন, সমাজ থেকে অপরাধ দূর করা যাবে না। বিষবৃক্ষতে ফলেছে বিষময় চোখ ধাঁধাঁনো ফল। সেই ফল ছেলেমেয়ের হাতে তুলে দেওয়া চলবে না। তার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে তাকে কাঁদাতে হবে, বাঁচাতে হবে।

আর শিকড় উপড়াতে হবে বিষবৃক্ষটির। তা না করে তরুণ প্রজন্মের হাতে সেই বিষময় ফল তুলে দেওয়া এবং সে ফল খাওয়ার অপরাধে আবার তাদের শাস্তিও দেওয়া হবে চরম অমানবিক।

লেখক : সাংবাদিক।

উত্তরপূর্ব২৪ডটকম/ডেস্ক/টিআই-আর

এ বিভাগের আরো খবর


সর্বশেষ খবর


সর্বাধিক পঠিত