সর্বশেষ

  কানাইঘাটে লেগুনার ধাক্কায় নিহত ট্রাক চালকের দাফন সম্পন্ন   মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে আত্মপ্রকাশ করলো ‘হাত বাড়াও’   ছাতকে সাজাপ্রাপ্ত আসামী গ্রেফতার   মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে ছাতকে ভাই-বোনসহ আটক ৩   ছাতকে দু’পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১৫   বিশ্বভারতীতে শেখ হাসিনার জন্য প্রস্তুত উপহারের ডালি   সুধীজনদের মিলনমেলায় সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের ইফতার মাহফিল সম্পন্ন   শাবিতে কর্মচারীকে বেধড়ক পিটুনী   বাহুবলে বিদ্যুৎ স্পৃষ্টে কৃষকের মৃত্যু   বিদ্রোহী কমিটি গঠন নিয়ে সিলেট জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিবৃতি   মিসবাহ সিরাজকে শুভেচ্ছা জানালেন নবগঠিত সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের নেতৃবৃন্দ   জমির উদ্দিন ভুলাই মেম্বারের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দোয়া ও ইফতার মাহফিল   বিশ্বনাথের দিঘলীতে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ শুরু   রোহিঙ্গা শিশুদের সঙ্গে গল্প-খুনসুটিতে প্রিয়াংকা চোপড়া   ওসমানীতে ২ কোটি টাকার বিদেশি মুদ্রাসহ আটক ১   রাজনগরে ভাইয়ের হামলায় আহত ভাইয়ের মৃত্যু   বনানীতে সমাহিত করা হবে তাজিন আহমেদকে   প্রকৌশলী আব্দুল কাদিরকে সংবর্ধনা   ফের সন্ত্রাসী সংগঠনের আখ্যা পেল বিএনপি   কুলাউড়ায় অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ২০ লক্ষ টাকার ক্ষয়ক্ষতি

ভাটি বাংলার অহংকার কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক বীর মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরী

প্রকাশিত : ২০১৭-১০-১০ ১৯:৩৫:৪৪

আপডেট : ২০১৭-১০-১০ ২০:৪৬:১৯

বেলাল আহমদ চৌধুরী ॥ হযরত হাসান বসরী (রা:)- এর উপদেশ- মৃত্যুর পর তোমাকে মানুষ কিভাবে মূল্যায়ন করবে তা তোমার চোখের সামনে যারা মৃত্যুবরণ করেছে তাদের পরিণতির মধ্যেই দেখতে পাবে। তাদেরকে কিভাবে মানুষ স্মরণ করছে তা লক্ষ্য কর এবং বিশ্বাস কর যে, তোমাকেও অনুরূপভাবে স্মরণ করবে। এ প্রসঙ্গে হাদীসে আছে- “আদ দুনিয়াউ মাজরাতুল আখেরা” অর্থ হলো ‘দুনিয়া আখেরাতের ক্ষেত্র স্বরূপ।’
ফিরে যাওয়ার জন্যইতো আসা। এই সীমাবদ্ধ জীবনকে যারা মানুষের কল্যাণের জন্য ব্যয় করে সমাজে সৌরভ ছড়াতে পারেন তবে তাঁরাই সফল। জ্ঞানী ব্যক্তি বলেন- কে কোথায় জন্মালো সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো জীবনটা শেষ হলো কোথায় তার উপর।
ভাটি বাংলার অহংকার কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা সদ্য প্রয়াত সালেহ চৌধুরী নির্লোভ দেশ আর মানুষের প্রতি নিষ্ঠ ছিলেন। বৈচিত্র্যমন্ডিত কিছু তথ্য উপাত্ত তার কৈশোরের ‘নমই মামু’, আমার চাচাত ভাই সিনিয়র এভভোকেট কবি ও লেখক নজমুল হক চৌধুরীর নিকট থেকে পাওয়া যায়।
সালেহ চৌধুরী সুনামগঞ্জ জেলার ভাটি এলাকার দিরাই থানার অন্তর্গত গছিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত বংশে পিতা আজমান বাহার চৌধুরীর ওরশে এবং মাতা আছিয়া খাতুন চৌধুরীর গর্ভে ২৫ কার্তিক ১৩৪৩ বাংলা ১১ নভেম্বর ১৯৩৬ সালে পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হন। তিনি পিতা মাতার পঞ্চম সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন।
পিতা তাঁর পরিচিতির জন্য একটি দীর্ঘ নাম জড়িয়ে দিয়েছিলেন আবু ওবায়দা মোহাম্মদ সালেহ উদ্দিন চৌধুরী। এক সময় স্কুলের খাতায় সংক্ষিপ্ত হয়ে দাঁড়ায় এ.ইউ.এম সালেহ উদ্দিন চৌধুরী হিসাবে। এমন দীর্ঘ নামের বোঝা অসহ্য ঠেকায় তাই ভেঙ্গে ভেঙ্গে নাম ব্যবহার করেতেন তিনি। তবে বর্তমান নামকরণের কাহিনী অন্য আরও একটি কাহিনীর জন্ম দেয়। আমার নাম সালেহ চৌধুরী। এটাও এই মুক্তিযুদ্ধের দান। এর আগে সালেহ চৌধুরী নামে কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমার আব্বা আমাকে একটা দীর্ঘ নামের মালা পরিয়ে দিয়েছিলেন। একটু বোধ হওয়ার পর পরই নামের শেষ পদ বা পদবী চৌধুরী বর্জন করেছিলাম। প্রথম অংশটা ব্যবহার করতাম সৃজনশীল লেখা-লেখিতে, আর, বাকী মোহাম্মদ সালেহ উদ্দিন হয়ে দাঁড়ায় আমার পোশাকী বা ব্যবহারিক নাম। নাম বলতে হলে সংক্ষেপে সালেহ বলাই আমার অভ্যাস। কিন্তু, এলাকায় যুদ্ধ শুরু করায় সকলেই তো পারিবারিক পরিচয় জানত। আমার সালেহ-এর সঙ্গে তাই লোকমুখে চৌধুরী যুক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে যায় সালেহ চৌধুরী। যুদ্ধের অসংখ্য স্মৃতির মতো ওটাও আমার প্রিয় হয়ে ওঠে। একাত্তর থেকেই আমি তাই সালেহ চৌধুরী (ভাটি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার)
সালেহ চৌধুরী গছিয়া প্রাইমারী স্কুলে শেষ করে ১৯৫১ সনের মাঝামাঝি মৌলভীবাজার এসে কাশীনাথ উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তৎকালে মৌলভীবাজার নামকাওয়াস্তে বিদ্যুৎ ও পাকা রাস্তা ও দালান কোঠা বিহীন একটি মহকুমা শহর। কিন্তু শহরের আকর্ষণ ছিল সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়। বছরের মধ্যখানে এসে সরকারী স্কুলে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে কাশীনাথ স্কুলে ভর্তি হন। এক সময় সরকারী বিদ্যালয়ে শিক্ষক সৈয়দ শামছুল ইসলামের ঐকান্তিক ইচ্ছায় নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন।
সালেহ চৌধুরী স্কুল জীবন থেকেই ছিলেন সাহিত্য অন্তপ্রাণ। বই পড়া, লেখা-লেখি, আঁকা-আঁকি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। গ্রাম থেকে মৌলভীবাজার শহরে এসে পেয়ে যান শ্রীলক্ষী আর চন্দ্রনাথ লাইব্রেরির মতো দু’টো বই এর দোকান। এক সময় তিনি পাঠ্য বইয়ের বাইরে আউট বই বেশী-বেশী পড়তেন। পাঠ্য বইতে আগ্রহ না হলেও বই পড়াশুনা তাকে শিক্ষকদের কাছে প্রিয় ছাত্র করে তুলেছিল। তিনি স্কুলে বির্তক, উপস্থিত বক্তৃতা, আবৃত্তি প্রভৃতিতে আসর জমিয়ে দিতে পারতেন। স্কুলে ছাত্রাবস্থা থেকেই লেখালেখি ও আঁকা-আঁকি আত্মীয় ও বন্ধু মহলে চাউর হয়েছিল।
সালেহ চৌধুরী ১৯৫৫ সনে এসএসসি পাশ করে সিলেট এমসি কলেজে এসে পড়া শেষ করে তার কথায় আগস্ট ১৯৬১ পি.আই.এ বিমানে করে ছেলেটি লাহোর গিয়েছিল পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার একটা বৃত্তি পাওয়ার সুবাদে। মোটামুটিভাবে একজন ভালো পাকিস্তানি হিসাবেই ওখানে যায়। কিন্তু দু’বছর পর ঢাকায় ফিরে এসেছিল একজন খাঁটি বাঙালি হয়ে। বাঙালিদের কোন দৃষ্টিতে দেখা হতো তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ প্রকাশনা সংস্থা ফিরোজ সন্স লিঃ -এর উর্দূ অভিধান। এতে বাঙালি শব্দটি ব্যবহারের নমুনা হিসাবে যে বাক্যটি ছাপা হয় তা ছিল অনেকটা এ রকম- ‘আগর বাঙালি ইনসান হো তো প্রেত কহ কিসকো?’ অর্থ হলো- ‘বাঙালি যদি মানুষ হয়, প্রেত বলব কাঁকে?’ (ভাটি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার)
সালেহ চৌধুরী সমাজকর্ম বিষয়ে মাষ্টার্স করে ১৯৬৩ সালে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন। চাকুরী নিলে লেখালেখিতে ব্যতয় ঘটবে বলে কোন সরকারী চাকুরীতে যোগদান করেননি। এক সময় ‘সোনার বাংলা’ নামে একটি অর্ধ-সাপ্তাহিকে ঢুকেছিলেন। এরপর মুনায়েম খানের ‘দৈনিক পয়গাম’ পত্রিকায়। তাছাড়া ‘আওয়াজ’ পত্রিকায়ও কাজ করেছেন। তারপর সালেহ চৌধুরী ‘দৈনিক পাকিস্তানে’ কর্মরত সাংবাদিক ছিলেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা শুরু হলে ঢাকার অনেক সাংবাদিক স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদান করেন। কলম সৈনিক হিসাবে মানুষকে উজ্জীবিত করতে তাদের মধ্যে অনেকে সংবাদ পাঠক, পত্রিকা লেখক ও সংবাদ ভাষ্য প্রণয়নে ভূমিকা পালন করেছেন, কিন্তু সালেহ চৌধুরী চলে এলেন ভাটি বাংলায় রণাঙ্গনে কলম ছেড়ে রাইফেল ধরলেন। জড়িয়ে পড়েন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে।
স্বদেশ প্রেম ঈমানের অঙ্গ। এই বাণী তার চিন্তায়, চেতনায় ও অনুভূতিতে নাড়া দিয়েছিল বলে অকুতোভয় সালেহ চৌধুরী এবার নতুন পথে যাত্রা শুরু করলেন। টেকেরহাট সাব-সেক্টর থেকে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত করে ভাটি এলাকায় অপারেশন শাল্লা থেকে দিরাই। তারপর জগন্নাথপুর, আজমিরীগঞ্জ, তাহেরপুরকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র নেতৃত্ব দেন। সালেহ চৌধুরী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, জন্মভূমির প্রতি তার ছিল অগাধ ভালবাসা ও ত্যাগ। তিনি জীবনকে বাজী রেখে যুদ্ধ করে গেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধার নাম ভাঙ্গিয়ে কোন বাড়তি সুযোগ গ্রহণ করেননি।
স্বাধীন দেশে সালেহ চৌধুরী ফিরে এলেন তার পূর্ব পেশা সাংবাদিকতায়। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি ‘দৈনিক বাংলায়’ সুনামের সাথে কর্মরত ছিলেন। তিনি আন্তর্জাতিক সাংবাদিক প্রতিষ্ঠান কমনওয়েলথ জার্নালিষ্ট এসোসিয়েশন (সিজিএ) এর বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি ছিলেন।
সালেহ চৌধুরী বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী ছিলেন। তিনি একজন আর্কিটেক্ট ও চিত্রশিল্পী ছিলেন। তিনি সুনামগঞ্জ সহ অনেক শহিদ মিনারের নকশা করেছেন। তিনি ফিচার লেখক ছিলেন। তিনি একজন দক্ষ দাবাড়– ছিলেন। নিয়াজ মুর্শেদ তার কাছে এসে দীক্ষা নিত। তিনি দাবা ফেডারেশনের সেক্রেটারীও ছিলেন। অনেক গুণের মধ্যে তাঁর আরও একটি বিষয়ে হাত ছিল তিনি একজন পটুয়াও ছিলেন। বহুগুণের গুণান্বিত চৌধুরী অন্য কিছুকে পেশা হিসাবে নেন নি শুধু নেশা হিসাবে নিয়েছেন। তিনি সর্বোপরি সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের উপরে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন।
সালেহ চৌধুরী সিলেটে ছাত্রাবস্তায় “ইশারা” নামে হাতে লেখা একটি পত্রিকা বের করেছেন। এই পত্রিকার সঙ্গে কবি দিলোওয়ার এবং কবি রিয়াছত আলী জড়িত ছিলেন বলে শুনা যায়। মুদ্রিত ত্রৈমাসিক আকারে ইশারা দু’টি সংখ্যাও বের হয়েছিল।
সুসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমদ সালেহ চৌধুরীকে নানা বলে ডাকতেন। সালেহ চৌধুরী ভ্রাতুষ্পুত্রের মাধ্যমে জানা যায়, সালেহ চৌধুরীর সহযোদ্ধা ছিলেন নজরুল। মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ছিলেন হুমায়ূন আহমদের সম্পর্কীয় নাতি। সালেহ চৌধুরী দৈনিক বাংলায় থাকাকালীন নজরুল হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে এসে তাঁর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। নজরুল যেহেতু হুমায়ূন আহমদের নানা সেই সুবাদে সালেহ চৌধুরী নানা হয়ে গেলেন।
সালেহ চৌধুরী “হুমায়ূন ও আমি” এবং “সৌখিনদার হুমায়ূন” ২টি বই লিখেছেন। তাছাড়া তিনি হুমায়ূন আহমদের ১০টি বাছাই গল্প বইয়ের সম্পাদনাও করেছেন। তিনি “নরওয়ের রূপকথা” নামে একটি ভ্রমণ কাহিনীও লিখেছেন। তাছাড়া বিস্মৃত কাপ্তান মিয়া এবং দাবার গ্র্যান্ড মাষ্টার নিয়াজ মুর্শিদকে নিয়ে বই লিখেছেন “নিয়াজ মুর্শেদ ও তার দাবা”। তিনি ছোটদের জন্য “দারকিনার বিয়ে” নামে বই লিখেছেন। তিনি সুনামগঞ্জের কবি প্রজেশ কুমার রায়ের কবি ও কবিতা বই-এর সম্পাদনা করেছেন। তাছাড়া এই অগ্রজ প্রতীম প্রজেশ কুমার কবিকে নিয়ে লিখেছেন “এক যে ছিল” নামে একটি বই। তার লেখা মহান যুক্তিযুদ্ধের পিলে চমকানো কাহিনী ‘ভাটি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ-আমার অহংকার’। এতদ্ব্যতিত তিনি বিভিন্ন পত্রিকা, স্মারকগ্রন্থ ও সাময়িকীতে বহু প্রবন্ধ লিখে গিয়েছেন। তিনি জালালাবাদ এসোসোসিয়েশন থেকে আজীবন সম্মাননা এবং সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ থেকে সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন।
সালেহ চৌধুরী একটি ব্যতিক্রমী শখ ছিল। তিনি দেশ-বিদেশে যখনই যেতেন তখন তিনি লাঠি সংগ্রহ করতেন এবং লাঠি খুব পছন্দ করতেন। উপহার হিসাবে কেউ লাঠি নিয়ে আসলে খুবই খুশী হতেন। তিনি নাকি তার পরিজনের নিকট বলে রেখেছিলেন তার সংগৃহীত লাঠিগুলি যেন সযতনে থাকে। তিনি সব সময় এক ধরণের লাঠি নিয়ে চলা ফেরা না করে বিভিন্ন সময়ে এক এক ধরনের লাঠি হাতে নিয়ে বেরিয়ে যেতেন। লাঠি নিয়ে পথ চলতে তিনি খুবই স্বচ্ছন্দবোধ করতেন।
সালেহ চৌধুরী শহীদ মুক্তিযুদ্ধাদের স্মৃতি রক্ষার্থে শহীদ স্মৃতি ফলক স্থাপনে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি দিরাই থানার ঝটিচর গ্রামে শহীদ মেহেন্দ্র কুমার দাশের নামে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করেন। তাছাড়া তিনি ব্রাহ্মনীগাঁও (ভাইবোনা) গ্রামের শহীদ আরশ আলীর নামে আরও একটি স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন কিন্তু তা তার জীবদ্দশায় স্থাপিত হয়নি। এই তথ্যগুলি তাহার ভ্রাতুষ্পুত্র চৌধুরী মোহাম্মদ নাসের ছমির নিকট থেকে জানা যায়।
সালেহ চৌধুরী বহুমাত্রিক প্রতিভাধর লেখক ছিলেন। তিনি আজীবন শিক্ষাব্রতী ও সাহিত্যসেবী ছিলেন। তাঁর শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংবাদিকতার ভালবাসা সর্বত্র প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে বিদগ্ধ প্রাবন্ধিক কবি ও সাংবাদিক। পেশার সাথে কাব্যচর্চার জাল বুনন করে চলেছেন। তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন জীবন ক্ষণস্থায়ী। ক্ষণস্থায়ী জীবনকে অনন্তকাল ধরে রাখার মাধ্যমই হলো ‘বই’- যা মানুষকে মহিমান্বিত করে তুলে। তার প্রকাশিত লেখাগুলো মৃন্ময় নয়, চিন্ময়। মনের মাধুরী দিয়ে লেখা। তাঁর কাব্যে ক্লান্তি ও হতাশা নেই। পাঠক তাঁর লেখায় প্রকৃত সুপথের বাতায়ন দেখতে পান। সাহিত্যে তাঁর নির্মোহ প্রয়াস সফল হয়েছে। ব্যক্তিজীবনে ও সালেহ চৌধুরী সফল ও বুদ্ধিদীপ্ত লোক ছিলেন।
কথা সাহিত্যিক ও সাংবাদিক বীর মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরী ১লা সেপ্টেম্বর ২০১৭, শুক্রবার ৮১ বছর বয়েস ইন্তেকাল করেছেন। তার মৃতদেহ গ্রামের বাড়ী গছিয়ায় দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি সহধর্মিনী সাহেদা চৌধুরী এবং তিন পুত্র ওবায়েদ আজমান, ইয়াসির আজমান ও ইয়ামীন আজমান সহ বহু আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
সিলেটের কৃতি সন্তান স্থপতি সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালেক কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কলাভবন চত্ত্বরে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলার নারী-পুরুষের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ও বিজয়ের যে প্রতীক “অপরাজেয় বাংলা”র নামকরণ করেছেন সালেহ চৌধুরী।
সালেহ চৌধুরী আজ নেই। এই সংসারে কোন কিছুই চিরস্থায়ী নয়। বাউল লালন ফকির বলেছেন- ‘খাঁচার ভিতর অঁচিন পাখি ক্যামনে আসে যায়/ধরতে পারলে মনো বেড়ি দিতাম তার পায়’। মহাকালের কাছে শেষ পর্যন্ত সবই গৌণ। মানুষ এর চেয়ে বেশী কিছু নয়। মানুষ নশ্বর, তবে শ্রদ্ধাভরে তাকে স্মরণ করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় বলতে চাই-
ওগো গুণী
কাছে থেকে দূর যারা তাদের বাণী যেন শুনী
তুমি থাকো তাহাদের জ্ঞাতি
তোমার খ্যাতিতে তারা পায় যেন আপনারাই খ্যাতি
আমি বারংবার
তোমারে করি নমস্কার।


লেখক : কবি ও কলামিষ্ট।

সর্বশেষ খবর


সর্বাধিক পঠিত