সর্বশেষ

  বিশ্বনাথে সিএনজি ও রিক্সা শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় আহত ২০   প্রত্যাশার চেয়েও বেশি এগিয়েছে সদর উপজেলা স্পোর্টস একাডেমি: আশফাক আহমদ   মীরেরগাঁওয়ে বজ্রপাতে নিহত ৩ কিশোরের জানাজা সম্পন্ন : অনুদান প্রদান   মৌলভীবাজারে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে আটক ৩   সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুস সাত্তার আর নেই: এমপি মানিকের শোক   ছাতকে আওয়ামী লীগ নেত্রীর মাতৃ বিয়োগ : এমপিসহ বিভিন্ন মহলের শোক   বিশ্বনাথের খেলাফত মজলিসের ইফতার মাহফিল সম্পন্ন   বিশ্বনাথে প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত ১   শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বে আজ দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ :শফিক চৌধুরী   সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু   মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে ৩ ভাইয়ের মৃত্যু   সিলেটে ছাত্রলীগ কর্মী মিন্নতের কব্জিকর্তন মামলার প্রধান আসামী শাহীনসহ গ্রেফতার ২   ছাতকে সংঘর্ষের ঘটনায় থানায় পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের   কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি-লিট ডিগ্রি পেলেন শেখ হাসিনা   ছাতকে পৃথক সংঘর্ষে আহত ৫০, গ্রেফতার ১   জকিগঞ্জে ফেন্সিডিলসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার   এতিমদের নিয়ে ক্যাডেট কলেজ ক্লাব সিলেটের ইফতার মাহফিল   শাবিতে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ওয়েবসাইট উদ্বোধন   শাবির স্বপ্নোত্থানের ঈদবস্ত্র বিতরণ   সেই কলকাতাকে হারিয়ে ফাইনালে সাকিবদের হায়দরাবাদ

স্মৃতির পাতায় মাওলানা মুজিবুর রহমান কামালী

প্রকাশিত : ২০১৭-১০-০৭ ১৯:০০:০৪

মুহাম্মদ ওলীউর রহমান মানিক : শনিবার, ০৭ অক্টোবর ২০১৭ ॥ তখন ২০০৬ সাল। সিলেট শহরতলীর প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ সোনাতলা সিরাজুল ইসলাম আলিম মাদরাসার ৭ম শ্রেণীর ছাত্র আমি। শ্রেণী কক্ষে পাঠ দিচ্ছেন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মাওলানা সাঈদুর রহমান। কথা প্রসঙ্গে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কথা আসে। তিনি নাকি ছোটবেলায় যখন কোন বই পড়তেন তখন বইয়ের পাতা ছিড়ে ফেলে দিতেন। তাঁর মা বাবা ও শিক্ষক বার বার মানা করার পরও একই কাণ্ড করতে থাকেন। একদিন তাঁর শিক্ষক খুব রাগান্বিত হয়ে বললেন, তুমি বই ছিড়ে ফেলছ কেন? তিনি বললেন, যা পড়ে ফেলছি তা রেখে কী লাভ। এবার শিক্ষক অন্য একটি বই হাতে নিয়ে বললেন, তুমি যতটা পাতা ছিড়েছ সব বলে যাওতো। তিনি যতটা বইয়ের যতটা পাতা ছিড়ে ফেলেছেন, তা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে অনর্গলভাবে বলে গেছেন। সেই ছোট্ট ফজলুল হকের স্মরণশক্তি ও মেধার প্রখরতা দেখে তার শিক্ষক আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন। সাইদুর রহমান হুজুর এবার বললেন- আমাদের মাদরাসা থেকেও একজন ফজলুল হক বের হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর নাম মাওলানা মুজিবুর রহমান কামালী। তিনি ১৯৮২ সালে দাখিল পরীক্ষা দিয়ে বের হয়েছিলেন। তার স্বরণশক্তি ও মেধা এতটাই প্রখর যে, একটি কিতাবের যে পৃষ্টা পাঠ্যদানের সময় যে শিক্ষক যা বলেছিলেন তা এখনও তিনি গড় গড় ভাবে বলতে পারবেন! প্রত্যেকটি কিতাবের সূচনা থেকে সমাপ্ত পর্যন্ত তার মুখস্ত থাকত! হুজুরের মুখে কামালী হুজুরের কথা শুনে শ্রেণীকক্ষে আমরা সবাই আশ্চর্য হয়ে গেলাম। সেইদিন থেকে কামালী হুজুরের কথা হৃদয়ের মনিকোঠায় লিখা হয়ে যায়। তাঁর প্রতি বেড়ে যায় সম্মান ও শ্রদ্ধা। তিনি আমাদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেন।
সিরাজুল ইসলাম আলিম মাদরাসা কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার কোন সঠিক সন তারিখ পাওয়া যায়নি। তবে ১৯৩০ সালের কিছু কাগজ পত্র পাওয়ায় ধরা হয় এটি ১৯৩০ সালেই স্থাপিত। মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর প্রথম কোন পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ১৯৮২ সালে। সেই পরীক্ষায় একমাত্র অংশগ্রহণকারী মাওলানা মুজিবুর রহমান কামালী কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। তার পথ ধরেই শত শত ছাত্র ছাত্রী মেধার স্বাক্ষর রেখে অত্র প্রতিষ্ঠান হতে বের হয়ে গেছেন এবং যাচ্ছেন। মাওলানা কামালী মাদরাসার প্রবীণ নবীন অনেকেই আইকন হিসেবে মানেন। মাদরাসার সাবেক ছাত্র ও বর্তমান উপাধ্যক্ষ মাওলানা ইবরাহীম আলী, বর্তমান আরবী প্রভাষক মাওলানা ক্বারী নুরুল হক, শিক্ষক মাওলানা মুজাহিদ উদ্দীন, কলামিষ্ট সালাম বিন রশিদ, আব্দুল মালিক মামুন, মাওলানা এবিএম আব্দুল গাফ্ফার, মাওলানা আজির উদ্দিন পাশাসহ সাবেক প্রায় সকল কৃতি ছাত্রই তাঁর প্রসংশায় ছিলেন পঞ্চমূখ। অধ্যক্ষ হযরত আল্লামা হাফিজুর রহমানও বাদ যাননি তাঁর প্রশংসা করা থেকে। প্রায় সময়ই শ্রেণী কক্ষে তাঁকে নিয়ে আলাপ হত। তাঁর মেধার প্রখরতা, মাদরাসার সবচেয়ে কঠিন বিষয় ইলমে ফিকহ এর উপর দক্ষতার কথা আলাপ হত হর-হামেশাই। আলোচনা হত তাঁর চারিত্রিক মাধুর্যতা, গাম্ভীর্যতা ও সততার কথা। যখনই তার কথা আলোচনা হত তখনই মনের মধ্যে অন্যরকম এক অনুপ্রেরণা পেতাম। মনে মনে ভাবতাম কখন যে আমাদের আইকন সেই প্রিয় ব্যক্তিত্বের দেখা পাবো।
জানা যায়, মাওলানা মুজিবুর রহমান কামালী সিরাজুল ইসলাম আলিম মাদরাসায়ও শিক্ষকতা করেছেন কয়েক বছর। পরে তাঁর নিজ এলাকাবাসীর একান্ত অনুরোধে তিনি সুপার হিসেবে যোগদান করেন গোয়াইনঘাট উপজেলার আঙ্গারজুর দাখিল মাদরাসায়। তাঁর যোগ্য নেতৃত্ব ও কর্ম দক্ষতায় মাদরাসাটি অল্প কিছুদিনেই আলিম মাদরাসায় রূপ নেয়। শিক্ষাক্ষেত্রে অবহেলিত গোয়াইনঘাট উপজেলায় শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অনন্য অবদান সর্বজন স্বীকৃত। আমার ওয়ালিদ মুহতারাম হযরত হাফিজ ক্বারী মুহা: আছকর আলী ও মাওলানা কামালী প্রায় সমবয়সী। আল ইসলাহ-তালামীযের প্রতি অধ্যক্ষ কামালীর অগাধ ভালবাসা, এলাকায় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের প্রচার প্রসারে তাঁর অবদান, তাঁর আমল আখলাক, তাঁর প্রতি এলাকার মানুষের ভালবাসাসহ আরো কত প্রশংসার গল্প শোনেছি আব্বার কাছ থেকে।
সিরাজুল ইসলাম আলিম মাদরাসা থেকে ২০১০ এ দাখিল ও ২০১২ এ আলিম শেষ করে বের হই আমি। হৃদয়ের পিঞ্জরে যাকে আইকন হিসেবে মানি, যার নামকে প্রাণ ভরে শ্রদ্ধা করি, যার প্রশংসা শোনে নিজে নিজে উৎসাহে উৎফুল্লিত হই, সেই কামালী হুজুরের সাথে দেখা হয়নি তখনও। হলেও নামে মানুষে হয়নি। আর ছোট্ট থাকতে হলেও আমার স্মরণ নেই। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দাখিল আলিম উত্তীর্ণ পূণর্মিলনী অনুষ্ঠানের উপদেষ্টা পরিষদে সাবেক বর্তমান সকল ছাত্রদের পক্ষ থেকে তাঁকে রাখা হয় উপদেষ্টা হিসেবে। সেই সুবাদে এক প্রস্তুতি সভায় উপস্থিত হন তিনি। আমি উপস্থিত হওয়ার আগেই মিটিং শুরু হয়। মিটিংয়ে নতুন মুখ দেখেই পাশের এক সিনিয়র ভাইকে জিজ্ঞাস করি উনি কে। তিনি বললেন মাওলানা মুজিবুর রহমান কামালী। প্রাণ ভরে দেখলাম অন্তরের অন্তস্থলে লুকিয়ে থাকা পরম শ্রদ্ধেয় আইকনকে। তাঁর মায়াবী চেহারা দেখেই আমার শ্রদ্ধা আরো বেড়ে গেল। মিটিং শেষে সবাই চা নাস্তাতে ব্যস্ত। আমি বসে রেজুলেশন লিখছি। হঠাৎ পিছনে কে যেন হাত দিলেন। চেয়েই দেখি কামালী হুজুর। সালাম দিয়ে সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গেলাম ও কদমবুছি করতে চাইলাম। তিনি আমার হাতে ধরে পরম স্নেহে ঠেনে নিলেন বুকে। আমি লজ্জায় অনেকটা বিব্রত হয়ে গেলাম। বললেন- তুমি হাফিজ আছকর আলীর ছেলে না?
-জ্বী।
-মাশা আল্লাহ। তোমাকে সেই ছোট্ট ওলীউর দেখছিলাম। আজ অনেক বড় হয়ে গিয়েছ। তুমার বাবা কেমন আছেন?
-জ্বী ভাল আছেন। দোয়া করবেন হুজুর।
-বাপকা বেটা। বেশি বেশি লেখাপড়া করে বড় আলেম হও।
-দোয়া চাই হুজুর।

দ্বিতীয় বারও শেষ দেখা হয়েছিল পূণর্মিলনী অনুষ্ঠানের দিন। দুপুরের খাবারও খেয়েছিলাম একসাথে। এরপর আর দেখা হয়নি মাওলানা কামালী হুজুরের সাথে। তাঁর কথাটা রাখতে পারিনি আমি। লেখাপড়া শেষ করার আগেই জীবিকার সন্ধানে আসতে হল দূর প্রবাসে।
অক্টোবর মাসের ২ তারিখ সোমবার ডিউটি শেষে বাসায় এসে এফবি লগিং করতেই একটি মর্মান্তিক নিউজ আসল। মাওলানা কামালী হুজুর আর নেই! চলে গেছেন মাওলায়ে হাকীকীর সান্নিধ্যে। যেন আসমান ভেঙ্গে মাথায় পড়ল। প্রিয় ব্যক্তিত্ব কামালী হুজুর চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে! আর কখনও দেখা হবেনা তাঁর সাথে। মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া দিবেন না আর কখনও। বড় দূর্ভাগা আমি। সত্যিকারের ভালবাসায় নাকি খুব কষ্ট। আমার বেলায়ও তাই। খুব ভালবাসতাম ও শ্রদ্ধা করতাম অধ্যক্ষ কামালী হুজুরকে। অথচ তাঁর শেষ জানাযাটাও আমার ভাগ্যে জুটলো না। অধ্যক্ষ মাওলানা মুজিবুর রহমান কামালী আনজুমানে আল ইসলাহ'র উপজেলা সভাপতি ও জেলার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকলেও সকল দলের মানুষের সাথে উনার ছিল সু সম্পর্ক। তাঁর জানাযাও প্রমাণ দিল তাই। তাঁর ইন্তেকালের খবর শোনে দলমত নির্বিশেষে সবাই আসছিলেন প্রিয় কামালীকে একনজর দেখতে। আলেম উলামা, ছাত্র শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিকসহ হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল গোয়াইনঘাট উপজেলার আঙ্গারজুরের দিকে। তাঁর জানাযা উত্তর সিলেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জানায়া হয়েছে। নিশ্চয় এটা তাঁর কর্মের ফল।
কবি বলেছিলেন "এমন জীবন তুমি করিবে গঠন, মরণে হাঁসিবে তুমি কাঁদিবে ভূবন।" আমাদের কাঁদিয়ে তিনি হেঁসে হেঁসে চলে গেলেন মাওলার দরবারে। তবে তিনি তাঁর কর্মগুণে হাজার বছর বেঁচে থাকবেন অসংখ্য গুণগ্রাহীর হৃদয় কন্দরে। তিনি চলে গেলেও হৃদয়ের মণিকোঠায় আজীবন লিখা থাকবে প্রেরণার এক অনন্য নাম, মাওলানা মুজিবুর রহমান। হাজার হাজার মানুষ গড়ার কারি অধ্যক্ষ কামালী ভাল থাকবেন পরপারে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। দয়ার সাগর আল্লাহ তা'লা তাঁকে জান্নাতের উচ্চ আসনে অধিষ্টিত করুন। আমিন।
উত্তরপূর্ব২৪ডটকম/এমওআর

সর্বশেষ খবর


সর্বাধিক পঠিত