সর্বশেষ

  মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে আত্মপ্রকাশ করলো ‘হাত বাড়াও’   ছাতকে সাজাপ্রাপ্ত আসামী গ্রেফতার   মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে ছাতকে ভাই-বোনসহ আটক ৩   ছাতকে দু’পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১৫   বিশ্বভারতীতে শেখ হাসিনার জন্য প্রস্তুত উপহারের ডালি   সুধীজনদের মিলনমেলায় সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের ইফতার মাহফিল সম্পন্ন   শাবিতে কর্মচারীকে বেধড়ক পিটুনী   বাহুবলে বিদ্যুৎ স্পৃষ্টে কৃষকের মৃত্যু   বিদ্রোহী কমিটি গঠন নিয়ে সিলেট জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিবৃতি   মিসবাহ সিরাজকে শুভেচ্ছা জানালেন নবগঠিত সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের নেতৃবৃন্দ   জমির উদ্দিন ভুলাই মেম্বারের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দোয়া ও ইফতার মাহফিল   বিশ্বনাথের দিঘলীতে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ শুরু   রোহিঙ্গা শিশুদের সঙ্গে গল্প-খুনসুটিতে প্রিয়াংকা চোপড়া   ওসমানীতে ২ কোটি টাকার বিদেশি মুদ্রাসহ আটক ১   রাজনগরে ভাইয়ের হামলায় আহত ভাইয়ের মৃত্যু   বনানীতে সমাহিত করা হবে তাজিন আহমেদকে   প্রকৌশলী আব্দুল কাদিরকে সংবর্ধনা   ফের সন্ত্রাসী সংগঠনের আখ্যা পেল বিএনপি   কুলাউড়ায় অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ২০ লক্ষ টাকার ক্ষয়ক্ষতি   ‘ঈদের আগে জকিগঞ্জ-সিলেট সড়কের সংস্কার কাজ শেষ করতে হবে’

আমার শিক্ষকজীবন : তেত্রিশ বছর কেটে গেল

প্রকাশিত : ২০১৭-০৯-১৮ ২০:০২:০২

আপডেট : ২০১৭-০৯-১৮ ২০:০৪:৩৮

আবুল ফতেহ ফাত্তাহ ॥ দিন কয়েক আগে আমার শিক্ষক অধ্যাপক বিজিতকুমার দে-র ৮৫তম জন্মদিন পালিত হল। সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে এই জন্মদিন পালনে স্যারের বন্ধু চিৎপ্রকর্ষবিদ আবুল মাল আবদুল মুহিতও যোগ দেন। আনন্দঘন এ অনুষ্ঠানে স্যারের শিক্ষকজীবনের অনেক মধুর স্মৃতি বক্তাদের কাছ থেকে উঠে এসেছে। অধ্যাপক বিজিতকুমার দে মদনমোহন কলেজে পাঠদান করেছেন অন্তরের তাগিদ থেকে। শিক্ষার্থী এবং সহকর্মীদের প্রতি তিনি সবসময় যতœবান ও সংবেদনশীল ছিলেন। আমার সঙ্গে স্যারের যে সম্পর্ক ছিল তা অনেকটা গুরু-শিষ্যের মত। স্যারের উদারচিত্ত, স্বতঃস্ফূর্ত মন ও আবেগী চেতনা সকলের জন্যে উন্মুক্ত ছিল। মদনমোহন কলেজে আমি যখন যোগ দিই তখন নৈশবিভাগে স্যার ক্লাস নিতেন। স্যার যখন দেখলেন এ ক্লাসটা তাঁর ছাত্রকেই ছেড়ে দেওয়া উচিত তিনি তাৎক্ষণিক আমাকে ডেকে নৈশবিভাগের ক্লাস নেবার দায়িত্ব দিলেন। বললেন, নতুন সংসারি হয়েছ তুমি এ ক্লাসটি নাও। তোমার উপকার হবে। স্যারের এই ঔদার্য আমি সারাজীবন মনে রাখব। বিজিত স্যার যখন অবসর নিলেন আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করলাম বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের। কিন্তু না, স্যার কিছুতেই বিদায় সংবর্ধনা নেবেন না। তাঁর যুক্তি, আমি যতদিন বাঁচি, এ কলেজের শিক্ষক হিসেবেই বাঁচতে চাই। কলেজের প্রতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর প্রতি তাঁর এই মনোভাব তাঁকে সমাজের একজন শিক্ষকই রূপান্তর করে। তিনি আমাদের সমাজেরই শিক্ষক। গত শুক্রবার আরেক বিদগ্ধ শিক্ষকের সান্নিধ্যে আমরা কয়েকজন গিয়েছিলাম। মদনমোহন কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সৈয়দ আবদুস শহীদ (১৯৩১)। শহীদ স্যারও নব্বইয়ের দশকে এ কলেজ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁকেও সম্ভবত আনুষ্ঠানিকভাবে কলেজ থেকে বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়নি। শহীদ স্যারেরও মনোভাব এরকম ছিল যে, তিনি কেন কলেজ থেকে বিদায় নেবেন। তিনিতো কলেজেরই একজন। এই মনোভাব একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের চিত্রকেই আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। যাঁরা সমাজকে শুধু দেবার জন্য এসেছেন, নেবার জন্যে নয়। মদনমোহন কলেজ জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠার পেছনে অধ্যক্ষ সৈয়দ আবদুস শহীদ-এর অবদান অবিস্মরণীয়। অসুস্থ শরীর নিয়ে স্যার এখন তাঁর গ্রামের বাড়ি বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাই ইউনিয়নের কাকুরা গ্রামের নিভৃত পল্লিতে অবস্থান করছেন। সুবিশাল বাড়ি সবুজ বৃক্ষে আচ্ছাদিত। মনে হয় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-বর্ণিত সবুজ নিসর্গের ঘ্রাণময় এক আঙিনা। স্যারের একজন নগণ্য ছাত্ররূপে দীর্ঘদিন পর যখন তাঁর মুখোমুখি হই  তখন মনে হয়েছে নিবেদিতপ্রাণ এই শিক্ষাব্রতী মদনমোহন কলেজকে তাঁর ঐকান্তিক নিষ্ঠা, সততা ও শৃঙ্খলাবোধ দিয়ে অনেকদূর এগিয়ে যাবার প্রেরণ যুগিয়েছেন। মদনমোহন কলেজ শিক্ষকআবাস ও জামে মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা ও উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন। তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে কলেজআবাস ও জামে মসজিদ আপন মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। আমরা স্যারের আত্মত্যাগ ও  শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুপ্রেরণা সৃষ্টির লক্ষ্যে কলেজ জামে মসজিদের নাম ‘সৈয়দ আবদুস শহীদ জামে মসজিদ’ নামকরণ করেছি। স্যারের সঙ্গে দীর্ঘদিন পর সাক্ষাতের সঙ্গে সঙ্গে বারবার বলছিলেন আমিতো কিছুই করতে পারিনি তোমরা কেন আমার নামে মসজিদটি নাম পরিবর্তন করছ। আমরা সবিনয় তাঁকে বলার চেষ্টা করেছি, স্যার এটা আমাদের জন্য উৎসাহ-উদ্দীপনা ও গৌরবের বিষয়। আপনার এতে হয়ত কিছুই যায় আসে না। আপনার মত নিষ্ঠাবান ও আত্মত্যাগী মানুষের নামে কলেজ মসজিদের নামকরণ করায় আমরা নিজেদের ধন্য মনে করছি। বিজিত স্যার ও শহীদ স্যারের ত্যাগী মনোভাব আমাকে আপ্লুত করে। তাঁদের মত একজন শিক্ষক হতে পারলে হয়ত মনে করতাম আমার শিক্ষার্থীদের আমি একটা কিছু দিতে পেরেছি। কিন্তু সময়তো অনেক গড়িয়ে গেল। দেখতে দেখতে আমার শিক্ষকজীবনের তেত্রিশ বছর কেটে গেল। মনে হয় এই সেদিন (১৯৮৪) বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে নবীগঞ্জ কলেজে শিক্ষকজীবনে পা রেখেছি। অথচ, এরই মধ্যে তেত্রিশ বছর সত্যি সত্যি কেটে গেল অনেকটা বিস্মৃতির মধ্য দিয়ে। তাহলে কি জীবনটাও এরকম? 

শিক্ষকতার রজতজয়ন্তীতে নবীগঞ্জ কলেজ প্রতিষ্ঠা নিয়ে একটা লেখার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু সেটাও শেষ পর্যন্ত লিখতে পারিনি। মানুষের জীবনে পঁচিশ বা তিরিশ বছর অনেকটা বেশি সময়। কিন্তু কালের বিচারে এই সময় জলবিন্দুর চেয়েও ক্ষুদ্রতর। আমার সীমিত জীবনের স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে অনেক কথাই আজ মনে পড়ছে। অজোপাড়াগাঁয়ের এক ছোট্ট বালক হাঁটি হাঁটি পা পা করে বাউশা প্রাইমারি স্কুল, নবীগঞ্জ জে.কে হাইস্কুল, মদনমোহন কলেজ, মুরারিচাঁদ কলেজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অতঃপর কর্মজীবনে পদার্পণ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে নবীগঞ্জের কতিপয় শিক্ষার্থী জড়ো হলেই নবীগঞ্জে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার কথা সবার মুখে উঠে আসতো। এভাবে একাধিক্রমে আমরা বসেছি, আলোচনা হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরোনোর পর নবীগঞ্জে এসে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেব বলে আমরা স্থির করি। নবীগঞ্জ তখন থানা থেকে উপজেলায় রূপান্তরিত হয়েছে। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় ফেরত জনাদশেক সতীর্থ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে আমরা স্বাক্ষাৎ করি। সময়টা ছিল ১৯৮৪ সালের জুলাই মাস। নির্বাহী কর্মকর্তা আমাদের উদ্দেশ্যের কথা জেনে কলেজ করার নানা ঝুঁকি, যোগ্য শিক্ষকপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাসহ কলেজের ভূমি, তার অবকাঠামো, অর্থ ও শিক্ষার্থী প্রাপ্তির ব্যাপারে আমাদের মতামত প্রত্যাশা করেন। আমরা প্রত্যেকেই একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার মিশন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়েছি বলে তাঁকে জানাই। ঠিক হলো পরবর্তী আগস্ট মাসে উপজেলার গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষানুরাগীসহ গণপ্রতিনিধিদের নিয়ে নির্বাহী কর্মকর্তা একটি সভা আহ্বান করবেন। সেই সিদ্ধান্ত অনুসারে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে নির্বাহী অফিসার দেলোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উপজেলার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষানুরাগী-গণপ্রতিনিধি ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন। সিদ্ধান্ত হয় যে, এ বছরই উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা হবে। আরও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, উপজেলাব্যাপী একটি প্রচারপত্রের মাধ্যমে কলেজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও সুযোগ-সুবিধা সংবলিত বিষয়াবলি সর্বত্র প্রচার করা হবে। সেই অনুসারে আমি, বদিউজ্জামান ভাই ও মুজিব ভাই এই দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য সিলেট যাই এবং সিলেট ওসমানিয়া প্রেস থেকে প্রচারপত্র, কলেজ ভর্তি ফরম, বেতন রসিদসহ আনুষঙ্গিক কাগজপত্র ছাপিয়ে কলেজে নিয়ে যাই। উল্লেখ্য যে, ১৯৭৩ সালে নবীগঞ্জের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ‘শাহনবী কলেজ’ নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন এবং সেই লক্ষ্যে জন্তরী গ্রামের দানশীল ব্যক্তিরা প্রায় সাড়ে ৮ একর ভূমি কলেজকে দান করেন। কিন্তু তাদের সেই মহতী উদ্যোগ সে সময় ফলপ্রসূ না হলেও তারই পথ ধরে ১৯৮৪ সালে আমরা যে কলেজ প্রতিষ্ঠায় অবতীর্ণ হই তার নামকরণ করা হয় ‘নবীগঞ্জ মহাবিদ্যালয়’। যা পরবর্তীতে নবীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। নবীগঞ্জ কলেজ বর্তমানে উল্লিখিত ভূমির ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রচারপত্র বিতরণের সঙ্গে সঙ্গে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ফরম বিতরণের কাজটি নবীগঞ্জ নতুন বাজারের খলিলুর রহমান চৌধুরী (সাবেক এমপি, বর্তমানে প্রয়াত)-র বাসভবনের সামনের একটি টিনের চালাঘরে শুরু হয়। ১৬ সদস্যের ওয়ার্কিং কমিটি এই ভর্তিকার্যক্রম শুরু করে। আমার মনে পড়ে, প্রথম ফরম সংগ্রহকারীর নাম নূরুন্নাহার পারভীন। নবীগঞ্জ কলেজের প্রথম ছাত্রী সে। এ বছর ১২৬ জন ছাত্রছাত্রী মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় ভর্তি হয়। ইতোমধ্যে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমরা বেশ ক’জন বিভিন্ন বিষয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত হই। যখন নিয়োগ পরীক্ষা চলছিল তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে  আমার এম.এ পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। কিন্তু কোনো সনদপত্র আমি বোর্ডকে দেখাতে পারিনি। বোর্ড সন্তুষ্ট হয়ে আমাকে সপ্তাহ দিন পরে সনদপত্র জমাদানের নির্দেশ দেন। উল্লেখ্য যে, যারা মৌখিক পরীক্ষায় অবর্তীর্ণ হয়েছিলেন তাদের মধ্যে আমি প্রথম স্থান অধিকার করি। আর সেই সুবাদে কমিটির সদস্যবর্গ অভিজ্ঞ কোনো অধ্যক্ষ প্রাপ্তির পূর্বে আমাকেই প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে মনোনয়ন দানের পক্ষে মত দেন। প্রস্তাব এসেছিল বাগাউড়া গ্রামের বদিউজ্জামান ভাইকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেবার। কিন্তু তাঁর অ্যাকাডেমিক ফলাফল বিবেচনায় কলেজের ওয়ার্কিং কমিটি আমাকেই এই দায়িত্ব অর্পণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে সরাসরি একটি কলেজ পরিচালনায় অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন খুব সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু আমরা যেহেতু একটি ব্রত নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলেজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বেরিয়ে এসেছিলাম সেই ব্রত পালনের জন্যেই আমি এই দায়িত্ব মাথা পেতে নিলাম। ১৯৮৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাউশা ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামে অবস্থিত বন্যার্ত শিবিরে কলেজের শুভ উদ্বোধন করা হয়। এর পরদিন থেকে শ্রেণিকার্যক্রম যথারীতি চলতে থাকে। আমার মনে পড়ে সে সময় কলেজ তহবিলে এককালীন ১৫ হাজার টাকা করে যাঁরা দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে সৈয়দ হাবিবুর রহমান (রাজা মিয়া), ডা. আবদুল জব্বার প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীতে মাসুম আহমদ জাবেদ এককালীন ২৫ হাজার টাকা কলেজ তহবিলে দান করেন। কলেজবোর্র্ডে এক হাজার ও ৫ শ টাকা যাঁরা নগদ দান করেন তাদের সকলের তালিকা সংরক্ষিত আছে (জানি না এখন তা আছে কী না)। পাঠদানে আমরা যারা সংশ্লিষ্ট ছিলাম তাদের মধ্যে মুজিবুর রহমান, সিরাজুল ইসলাম, মমতাজ সুলতানা, আবদুন নূর, মোহাম্মদ আবদুল হান্নান, মোহাম্মদ আকল মিয়া প্রমুখ। অফিস পরিচালনার জন্যে নয় মৌজা এমসি হাইস্কুলের শিক্ষক জ্ঞানরঞ্জন দাসও আমাদের উদ্যোগের সঙ্গে চাকরি ছেড়ে যোগ দেন। শ্রেণিকার্যক্রম শুরুর প্রাক্কালে আমরা নতুন বাজারের ব্যবসায়ী মো. নানু মিয়ার হোটেল আরজু-র ৮ নম্বর কক্ষে বসতাম, পরামর্শ করতাম ও নানা কর্মপন্থা নির্ধারণ করতাম। বলতে গেলে হোটেল আরজু ছিল আমাদের নবীগঞ্জ কলেজের অস্থায়ী কার্র্যালয়। নানু মিয়া আজ আর বেঁচে নেই। কিন্তু কলেজ প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁরও একটা আন্তরিক টান ছিল। অধ্যক্ষের বসার জন্যে চেয়ার টেবিলের প্রয়োজন। কিন্তু নতুন করে এগুলো বানানো বেশ ব্যয়সাপেক্ষ। তাই উপজেলা নির্র্বাহী কর্র্মকর্তা তাঁর অফিসের একটি রিভলবিং চেয়ার ও সেক্রেটারিয়েট টেবিল কলেজকে দিয়ে দেন। প্রয়োজনীয় বেঞ্চ এবং ডেক্স উপজেলা পরিষদ কলেজকে দান করে। এভাবেই বন্যার্ত শিবিরে কলেজের শ্রেণিকার্যক্রম শুরু হয়। আমার মনে পড়ে আমি যেদিন প্রথম ক্লাসে যাই সেদিন পর্যবেক্ষক হিসেবে উপজেলা নির্র্বাহী কর্মকর্র্তা দেলোয়ার হোসেন এবং আমার শিক্ষক নবীগঞ্জ জে.কে হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক চারুচন্দ্র দাশ উপস্থিত ছিলেন। জীবনের প্রথম ক্লাস। দু’জন পর্যবেক্ষক এবং হলভর্তি শিক্ষার্থী। আমার মনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ক্লাস শেষে যখন অফিসকক্ষে আসি তখন নির্বাহী কর্মকর্তা ও চারুবাবু স্যার আমার অনেক প্রশংসা করেন। আমি শুধু তাঁদের শুভেচ্ছাটুকু গ্রহণ করি। এভাবেই শিক্ষকতার মতো এক মহান পেশায় আমি নিজেকে জড়িয়ে ফেলি।
কর্মজীবনে আমার তেত্রিশ বছর কাটল। হয়তো কেউ কেউ ভাবতে পারেন নবীগঞ্জ কলেজ কতোটা এগুলো আর আমি নিজে কতোটা কৃতকার্য হলাম। ১৯৮৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমি নবীগঞ্জ কলেজে কর্মরত ছিলাম। একই সালের ০১ অক্টোবর আমি মদনমোহন কলেজে যোগ দিই। এই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে নবীগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষ পদে আমার সহপাঠী গোলাম হোসেন আজাদ আসীন আছেন। আছেন অধ্যাপক তোফাজ্জল ইসলাম চৌধুরী, মুজিবুর রহমান, আবদুন নূর, সিরাজুল ইসলাম, মমতাজ সুলতানা, নাসরীন আহমেদসহ পরবর্তীতে যোগদানকারী সুহৃদ সহকর্মীবৃন্দ। বন্যার্ত শিবির থেকে কলেজটি জন্তরী গ্রামে (১৯৭৩ সালের প্রস্তাবিত ‘শাহনবী কলেজ’-ভূমি) স্থানান্তরিত হয়। আমার সময়ে দাতাদের স্বতন্ত্র দলিল সম্পাদনের মাধ্যমে নবীগঞ্জ কলেজের নামে উক্ত ভূমি দান করা হয়। উচ্চমাধ্যমিক কলেজটি এখন  স্নাতক পাস ও অনার্স পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। অসংখ্য শিক্ষার্থীর পদভারে মুখরিত হচ্ছে এর আঙিনা। আমার সময়ে ‘পদক্ষেপ’ নামে দু সংখ্যা দেয়ালিকা প্রকাশিত হয়। বিজয়দিবস উপলক্ষে ‘পদক্ষেপ ১৯৮৫’ নামে একখানা সাময়িকপত্রও প্রকাশ পায়। কলেজের নবীন শিক্ষার্থীদের লেখায় সমৃদ্ধ ছিল এ সংখ্যাগুলো। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ্য যে, নবীগঞ্জ বাজারে আমরা যখন কলেজ প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে প্রথম প্রথম আসা-যাওয়া করতাম তখন আমাদের কেউ কেউ লুঙ্গি পরেও আসতেন। একদিন এক ছাত্র লুঙ্গি পরে আমার ক্লাসে আসে। আমি তাকে খুব সহজভাবে আগামীদিন থেকে শার্ট প্যান্ট পরে ক্লাসে আসতে বলি। এর পরিবর্তন খুব ইতিবাচক হয়েছিল। দিন কয়েকের মধ্যে দেখা গেল নবীগঞ্জ বাজার এলাকায় কোনো ছাত্র প্যান্ট-শার্ট ছাড়া চলাফেরা করছে না। কলেজ করার ইতিবাচক এই পরিবর্তন লক্ষ করে আমরা যারা পাঠদান করছিলাম তারা প্রীত হই।

বৃহত্তর আঙিনার ডাকে মদনমোহন কলেজে আমার যোগদান। এ কলেজেই আমি উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে অধ্যয়ন করি। প্রভাষক পদেই এ কলেজে যোগ দিয়েছিলাম। পরবর্তী ধাপে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান পদে আমি আসীন হই। বিগত ১১ সেপ্টেম্বর ২০১১ তারিখে এ কলেজে আমি উপাধ্যক্ষ পদে যোগ দেই। অতঃপর ২০১৩ সালের ০৭ এপ্রিল  থেকে আমি এ কলেজের অধ্যক্ষ পদে কর্মরত। বাংলা বিভাগে কর্মরত থাকাবস্থায় ২০০৩ সালে আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করি। সব বিবেচনায় আমার শিক্ষক এবং সহকর্মীদের সান্নিধ্যে মদনমোহন কলেজ আমার জীবনে এক তীর্থক্ষেত্র। আর নবীগঞ্জ কলেজ উষালোকের দীপ্তি নিয়ে আমাকে আগামীর পথচলায় অনুপ্রেরণা যোগায়।

মদনমোহন কলেজে যেদিন নিয়োগের জন্য মৌখিক পরীক্ষা দিই সেদিন বোর্ডের তৎকালীন সভাপতি জেলা প্রশাসক আ.ন.ম হাফিজুল ইসলাম আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন আপনি তো একটা কলেজে আছেন। এখানে কেন আসতে চান? একজন বেকারের কর্মসংস্থান যেখানে হবে সেখানে আপনি ভিড় জমাচ্ছেন কেন? আমার সহজ জবাব ছিল, এই যে স্যাররা (বোর্ডে বেশিরভাগ সদস্যই আমার শিক্ষক ছিলেন) তাঁদের সান্নিধ্যে আসতে চাই। তাঁর জবাব ছিল আজকাল এসব আছে না কি? জবাবে আমি বলেছিলাম, স্যার ব্যতিক্রম বলে একটি কথা আছে। ধরে নিন আমি সেই ব্যতিক্রমের একজন। বিগত ৩৩ বছর শিক্ষকজীবনে কতটা অর্জন করেছি কিংবা শিক্ষার্থীদের দিতে পেরেছি এই সমীকরণ খুব সহজসাধ্য নয়। মাঝে মধ্যে মনে হয় আমি আমার শিক্ষার্থীদের কিছুই দিতে পারেনি। আবার কখনো মনে হয় যখন কোনো অপরিচিত জায়গায় যাই হঠাৎ করে একজন শিক্ষার্থী আমাকে সালাম করে, সমীহ করে কিংবা একজন শিক্ষার্থীর কৃতিত্বে আমি যখন প্রীতি অনুভব করি তখন মনে হয় আমি বোধহয় ওইসব শিক্ষার্থীর জন্যে কিছু একটা করতে পেরেছি। যদি কেউ আমাকে প্রশ্ন করেন এ পর্যন্ত আপনার জীবনে ভালো কাজ কোনটি? নির্দ্বিধায় বলবো নবীগঞ্জ কলেজ প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কর্ম। আবার নিজেকে যখন প্রশ্ন করি এতোদিনে জ্ঞানপ্রজ্ঞার জগতে আমি কতোটা অবগাহন করলাম তখন আমার সমস্ত অন্তরজুড়ে অন্তহীন তৃষ্ণা আমাকে আকুল করে রাখে। সীমিত জীবনে অসীম জিজ্ঞাসার জাল বিস্তার করা এক জীবনে কখনো কি সম্ভব? তেত্রিশ বছর কাটল কিন্তু কই জানার তো কিছুই হল না। দেবার যা দূরেই থাক।


লেখক : কবি ও লোকসংস্কৃতি গবেষক; অধ্যক্ষ, মদনমোহন কলেজ, সিলেট।

সর্বশেষ খবর


সর্বাধিক পঠিত