সর্বশেষ

  বিশ্বনাথে সিএনজি ও রিক্সা শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় আহত ২০   প্রত্যাশার চেয়েও বেশি এগিয়েছে সদর উপজেলা স্পোর্টস একাডেমি: আশফাক আহমদ   মীরেরগাঁওয়ে বজ্রপাতে নিহত ৩ কিশোরের জানাজা সম্পন্ন : অনুদান প্রদান   মৌলভীবাজারে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে আটক ৩   সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুস সাত্তার আর নেই: এমপি মানিকের শোক   ছাতকে আওয়ামী লীগ নেত্রীর মাতৃ বিয়োগ : এমপিসহ বিভিন্ন মহলের শোক   বিশ্বনাথের খেলাফত মজলিসের ইফতার মাহফিল সম্পন্ন   বিশ্বনাথে প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত ১   শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বে আজ দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ :শফিক চৌধুরী   সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু   মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে ৩ ভাইয়ের মৃত্যু   সিলেটে ছাত্রলীগ কর্মী মিন্নতের কব্জিকর্তন মামলার প্রধান আসামী শাহীনসহ গ্রেফতার ২   ছাতকে সংঘর্ষের ঘটনায় থানায় পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের   কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি-লিট ডিগ্রি পেলেন শেখ হাসিনা   ছাতকে পৃথক সংঘর্ষে আহত ৫০, গ্রেফতার ১   জকিগঞ্জে ফেন্সিডিলসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার   এতিমদের নিয়ে ক্যাডেট কলেজ ক্লাব সিলেটের ইফতার মাহফিল   শাবিতে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ওয়েবসাইট উদ্বোধন   শাবির স্বপ্নোত্থানের ঈদবস্ত্র বিতরণ   সেই কলকাতাকে হারিয়ে ফাইনালে সাকিবদের হায়দরাবাদ

সিলেটের গৌরব

প্রকাশিত : ২০১৭-০৯-১৭ ২৩:১১:৪৪

তবারক হোসেইন ॥ ‘শ্রীহট্ট লক্ষ্মীর হাট আনন্দের ধাম,
সর্বাপেক্ষা প্রিয়তর এ ভূমির নাম
প্রকৃতির ভান্ডারেতে শ্রীহট্টের মাঝে
কত শোভা, মনোলোভা সর্বত্র বিরাজে’

কবি প্যারি চাঁদ মিত্রের এই লেখায় যে ‘শ্রীহট্ট’, কালের বিবর্তনে সেটিই আজকের সিলেট বিভাগ বা সিলেট অঞ্চল। অবশ্য ১৯৪৭ সালে সিলেটের তৎকালীন করিমগঞ্জ মহকুমার আড়াই থানা ভারতে চলে যাওয়ায় আমরা আজ খণ্ডিত সিলেট নিয়ে আছি।

বাংলাদেশের ঈশান কোনে সিলেটের অবস্থান। ঐতিহাসিক দিক থেকে এ অঞ্চলের ঐতিহ্য অনেক সমৃদ্ধ। প্রাচীনকালে এ অঞ্চলের সভ্যতার কথা বিধৃত আছে অনেক ইতিহাস গ্রন্থে। নীহার রঞ্জন রায়ের ‘বাঙালির ইতিহাস’ গ্রন্থে সিলেটে সমৃদ্ধ সভ্যতার প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখিত হয়েছে। এমন সমৃদ্ধ সভ্যতার গৌরবময় ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে গর্ব করা সিলেটবাসীর জন্য খুবই সংগত।

সিলেটের উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণের কিছু অংশে আছে বিচিত্র ধরনের অরন্যানী ভরা সবুজ বনানীসজ্জিত পাহাড়ি অঞ্চল। পাহাড়ের মাঝ দিয়ে কুল কুল করে বয়ে চলে পাহাড়ি নদী ও ঝরনা। সিলেটের বনভূমি যেমনি জোগান দেয় বাঁশ ও গাছের, তেমনি এ বনভূমির অপরিসীম শোভা সিলেট অঞ্চলকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে পরিণত করেছে। সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলের সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যের জন্য জাফলং অঞ্চল এখন দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। পাশাপাশি রাতারগুল, লালাখান, বিছানাকান্দি—এসব এলাকা এখনই পর্যটনের নতুন নতুন আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাধবকুন্ডের জলপ্রপাততো খ্যাতিময়। ইদানীংকালে হাম হাম জল প্রপাতসহ আরও কিছু নতুন জল প্রপাত আবিষ্কৃত হওয়ার ফলে এসব জল প্রপাতকে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। জাফলং, শ্রীপুর, ভোলাগঞ্জ, প্রভৃতি স্থান থেকে উত্তোলিত পাথর বাংলাদেশের নির্মাণ শিল্পের প্রধানতম উপাদান।

জৈয়ন্তিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র দেশের প্রথম গ্যাস ফিল্ড যেখান থেকে গ্যাস উত্তোলিত হয়েছে। এখান থেকে এখন সীমিত পেট্রলও উৎপাদন হয়। কৈলাশটিলা, রশিদপুর, ছাতক, শ্রীমঙ্গলের মাগুর ছড়া গ্যাসক্ষেত্র এ অঞ্চলের মানুষের গৌরবের বিষয়। সিলেটের চুনাপাথর দিয়ে ছাতকে দেশের প্রথম ও একমাত্র সিমেন্ট কারখানা গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে কাগজের মণ্ড কারখানা এ গ্যাস দিয়ে চালানো হয়।

ভাটি বাংলা নামে পরিচিত সিলেটের হাওর অঞ্চল সিলেটের আরেক সম্পদের আধার। উজান থেকে নেমে আসা সুরমা, কুশিয়ারা, মনি খোয়াই, ধলাই, সোনাই, যাদুকাটা প্রভৃতি নদী নিয়ে নেমে এসে বর্ষাকালীন পানি জমে হাওরগুলো বর্ষাকালে টইটুম্বুর হয়ে যায়। সিলেট বিভাগে অর্ধ শতাধিক বড় বড় হাওর আর অসংখ্য বিল মাছের প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। হাওর আর বিলগুলোই দেশের মাছ উৎপাদনের প্রধান উৎস।

শীতকালে হাওরাঞ্চলে ফলে বোরো ফসল। শীতে বিলগুলোর তীরে এসে নামে বিচিত্র বর্ণ ও রঙের পাখি। মৌলভীবাজারের হাইল হাওরের বাইক্কা বিল অতিথি পাখির এক বিরাট অভয়ারণ্য। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময়ে বিল গলিতে অতিথি পাখির নয়নাভিরাম আনা গোনা সবাইকে মুগ্ধ করে। সুনামগঞ্জের শনির, টাঙ্গুয়ার হাওর, মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর দেশের পর্যটকদের আকর্ষণে পরিণত হচ্ছে। সিলেটের চা-বাগান সিলেট বাসীর অনন্য গর্বের বিষয়। দেশের ৯৮ ভাগ চায়ের চাহিদার জোগান দেয় সিলেটের চা-বাগান। সেই ১৮৫৭ থেকে শুরু হওয়া চা শিল্পের এখনো সিংহভাগ উৎপাদন হচ্ছে সিলেট অঞ্চল থেকে। বড়লেখার সুজানগর এলাকায় আগর গাছ প্রকৃতির এক অনন্য দান। এটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সুগন্ধি আঁতর শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস।


সিলেটের গৌরব অনিন্দ্যসুন্দর চা–বাগান l সৌজন্যে: বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে সমৃদ্ধ সিলেটের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এখন বন্য প্রাণীর এক অভয়ারণ্য। এটি এখন পর্যটনের আরেকটি আকর্ষণে পরিণত। চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ও রিসোর্ট। প্রাকৃতিক সম্পদ ও প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শিল্প নিয়ে গৌরব করে সিলেটবাসী যথার্থভাবে।
হজরত শাহজালাল (র.) সিলেটে পদার্পণ করেছিলেন ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি নিয়ে এসেছিলেন, তাঁর সঙ্গে ৩৬০ জন আউলিয়াকে, যাদের সমাধি ছড়িয়ে আছে সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায়। হজরত শাহজালাল (র.) এর মাজার ঘিরে যে আজও ইসলাম ধর্মীয় যে বাতাবরণ বিরাজমান, তা সিলেটবাসীর এক গৌরবের বিষয় বটেই। ঢাকা দক্ষিণে শ্রী চৈতন্যের জগন্নাথ মিত্রের বসত ভিটে ঘিরে গড়ে ওঠে শ্রী চৈতন্য, যিনি মহাপ্রভূ নামে খ্যাত, তার বৈষ্ণব ধর্মের একটি কেন্দ্র। ফলে এটিকে ঘিরে জাগরণ ঘটে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে। কিন্তু আনন্দদায়ক বিষয় হলো, সিলেট অঞ্চলে মুসলিম-হিন্দু সম্প্রদায় দুটো নিজ নিজ ধর্মের প্রতি যেমনি নিষ্ঠাবান ও অনুগত, তেমনি উভয় সম্প্রদায় বাস করছেন পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতে। এটিও সিলেটের গৌরব।

মরমি কবি হাসন রাজা, বাধারমন দত্ত, শীতালং শাহ্, দূরবিন শাহ, শেখ ভানু, সালেং বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম বাংলা লোকজ সংগীতের ক্ষেত্রে যে অবদান রেখেছেন, তা অবিস্মরণীয় এদের অনেকের খ্যাতিও প্রভাব আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে, যার জন্য আজ সিলেটবাসী গর্বিত। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তি ভাষা আন্দোলন। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি। সিলেট থেকেই উচ্চারিত হয়েছিল কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে এই বিষয়ে আলোচনা সভায় বাংলা ভাষা কে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ১৯৪৮ সালেই প্রবন্ধ লিখেছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী, মুসলিম চৌধুরী। সৈয়দ মুজতবা আলী রম্য সাহিত্য আজও বাংলা সাহিত্যে অননণ এবং অনুকরণীয় ধারা হিসেবে বিবেচিত হয়। এদের নিয়ে সিলেটবাসী গর্ব বোধ করেন।

বাংলাদেশের সবচেয়ে গর্বের বিষয় হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি ছিলেন জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী। সহ-প্রধান অধিনায়ক ছিলেন জেনারেল আব্দুর রব, সহকারী চিফ অব স্টাফ মেজর এ, আর চৌধুরী, সেক্টর কমান্ডার জেনারেল সি, আর, দত্ত আমাদের সশস্ত্র সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে সিলেটের সন্তান সামাদ আজাদ (পরবর্তীকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রী), তৎকালীন ছাত্রনেতা নূরুল ইসলাম (বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী) আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সংগঠনে ব্যাপৃত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক দল গুলোর সে সময় নেতৃত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আব্দুস সামাদ আজাদ, দেওয়ান ফরিদ গাজী, ন্যাপের কেন্দ্রীয় নেতা পীর হাবিবুর রহমান, কম্যুনিষ্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বারিন দত্ত (আব্দুস সালাম নামে পরিচিত)। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশে কর্মরত অবস্থায় পক্ষ পরিবর্তন করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বন করে মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছিলেন, এই সিলেটের সন্তান হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, শাহ্ এম, এস কিবরিয়া, আবুল মা’ল আবুল মুহিত (বর্তমান অর্থমন্ত্রী) মুক্তিযুদ্ধে এই সিলেটি সন্তানদের অবদানের ইতিহাস কোনো দিন ম্লান হবে না। সে সময়ের সংসদ সদস্য ছাতকের শহীদ আব্দুল হক, সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত রাইফেল কাঁধে যুদ্ধ করেছেন, তা কি কোনদিন বিস্মৃত হওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী, বাংলাদেশের প্রথম সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সিলেটের সন্তান। এদের নিয়ে সিলেট বাসী অবশ্যই গর্বিত। এ গর্ববোধ যথার্থ।
সিলেটই একটি অঞ্চল যার ছিল একটি নিজস্ব ভাষা, সিলেটি নাগরী। সিলেটবাসীর গর্ব করার আরও অনেক কিছুই আছে, যা এ পরিসরে বর্ণনা করা অসম্ভব, তাই এই কটি বর্ণনা করেই নিবূত হতে হলো।
উত্তরপূর্ব২৪ডটকম/ডেস্ক/টিআই-আর

সর্বশেষ খবর


সর্বাধিক পঠিত